• বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফার্মগেট, ঢাকা – ১২১৫
  • info@barc.gov.bd
  • ০২-৯১৩৫৫৮৭

Online সার সুপারিশমালা

সার প্রয়োগে বিবেচ্য বিষয় সমূহ

সার একটি মূল্যবান ও ব্যয়বহুল কৃষি উপকরণ। তাই ফসলক্ষেতে প্রয়োগকৃত সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। যথেচ্ছভাবে সার ব্যবহার করলে সারের অপচয় বৃদ্ধি পায় ও আর্থিক ক্ষতি হয়, ফসলের কাঙ্খিত ফলন পাওয়া যায় না এবং পরিবেশেরও ক্ষতি হয়। ইউরিয়া সারের বেলায় এটা বেশি প্রযোজ্য। ইউরিয়া একটি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী সার এবং এ সার যথাযথভাবে ব্যবহার করা না হলে বিভিন্ন উপায়ে শতকরা প্রায় ৬০-৭০ ভাগ অপচয় হতে পারে। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার তেমন একটা নষ্ট হয় না। এসব সার প্রয়োগকৃত ফসলে নিতে না পারলেও অবশিষ্টাংশ হিসেবে মাটিতে থেকে যায় এবং পরবর্তী ফসলে তা নিতে পারে। সারের কার্যকারিতা বাড়াতে ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সুষম মাত্রায় বিভিন্ন প্রকার সার প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ। সার প্রয়োগের সময় নি¤œ বর্ণিত বিষয়গুলি বিবেচনায় রাখতে হবে-

ফসল ও তার জাত, ফসলের খাদ্য চাহিদা, কাঙ্খিত ফলন

বিভিন্ন ফসলের খাদ্য চাহিদা বিভিন্ন রকমের। যেসব ফসলের দেহের গঠন বড় এবং ফলন বেশি তাদের খাদ্য চাহিদা বেশি। পক্ষান্তরে, যেসব ফসলের দেহের গঠন ছোট এবং ফলন কম তাদের খাদ্য চাহিদা কম। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ভুট্টা গাছের আকার আকৃতি ধান গাছের তুলনায় বড় এবং ফলনও বেশি। তাই ধান ফসলের তুলনায় ভুট্টাতে সার বেশি লাগে। ডাল জাতীয় ফসলে সার খুব কম লাগে। ফসলের স্থানীয় জাতের তুলনায় উফশী জাতের ফলন বেশি হওয়ায় উফশী জাতে সারও বেশি লাগে।

ফসলধারা

ফসলধারা বলতে এক বছরে এক খন্ড জমিতে ধারাবাহিকভাবে যে ফসল চাষ করা হয় তা বুঝায়। সার ব্যবহারেফসলধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশেষ করে বর্তমান ফসলের পুর্ববর্তী ফসল কি ছিল তা জানা জরুরী। সাধারনত ডাল ও শুটি জাতীয় ফসল এবং পাট এর পরবর্তী ফসলে সার কম লাগে। কিন্তুসরিষা, গম, চীনা, কাউন ইত্যাদি ফসলের পরবর্তী ফসলে সার বেশি লাগে।

মাটির উর্বরতা

সাধারনত উর্বর মাটিতে সার কম লাগে এবং কম উর্বর বা অনুর্বর জমিতে সার বেশি লাগে।

উৎপাদন মৌসুম

সার প্রয়োগে উৎপাদন মৌসুম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। খরিফ মৌসুমের তুলনায় রবি/শীত মৌসুমে ফসলের ফলন বেশি হয়। যেমন, আউশ ও আমন ধানের চেয়ে বোরো ধানের ফলন বেশি হয়; খরিফ মৌসুমের ভুট্টার চেয়ে রবি মৌসুমে ভুট্টার ফলন বেশি হয়। এ কারনে রবি মৌসুমে ফসলের খাদ্য চাহিদা বেশি থাকে। তাই খরিফ মৌসুমের তুলনায় রবি/শীত মৌসুমে বেশি মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হয়।

পানি ব্যবস্থাপনা (বৃষ্টি নির্ভর/সেচযুক্ত)

বৃষ্টি নির্ভর চাষে ফসলের ফলন কম হয় এবং সেচযুক্ত চাষে ফলন বেশি হয়। বৃষ্টি নির্ভর চাষে ফসল বপন পরবর্তীতে সার প্রয়োগের কোন নিশ্চয়তা থাকে না। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফসল বপনের পুর্বেই জমিতে সমুদয় সার প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া বৃষ্টি নির্ভর চাষে ফসলের ফলন কম হয় বিধায় ফসলের খাদ্য চাহিদাও কম থাকে; তাই সারও কম লাগে। পক্ষান্তরে, সেচযুক্ত চাষে ফসলের ফলন বেশি হয় বিধায় ফসলের খাদ্য চাহিদাও বেশি থাকে এবং তাই সারও বেশি লাগে।

জৈব সার, খামারজাত সার, সবুজ সার, ফসলের পরিত্যক্ত অংশ ব্যবহার

জৈব সার, খামারজাত সার, সবুজ সার ও ফসলের পরিত্যক্তঅংশে ফসলের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার খাদ্য উপাদান অল্প পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এসব সার জমিতে প্রয়োগ করা হলে পঁচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এসব খাদ্যোপাদানগুলি ফসলের গ্রহণোপযোগী হয়। এছাড়া এসব জৈব সার ব্যবহারে মাটির ভৌত গুণাবলীর উন্নয়ন হয় এবং অণুজৈবিক ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি পায়। ফলে মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি উাপাদান ফসলের গ্রহণোপযোগী হয়। তাই এসব জৈব সার ব্যবহার করা হলে রাসায়নিক সার কম লাগে।

রাসানিক সারের ধরণ ও প্রকৃতি

সার প্রয়োগে সারের ধরণ ও প্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। যেমন ইউরিয়া একটি ক্ষণস্থায়ী সার এবং জমিতে প্রয়োগের এক মাসের মধ্যেই এর কার্যকারিতা প্রায় শেষ হয়ে যায়। তাই এ সার ফসলে একবারে প্রয়োগ করা যায় না; ফসলভেদে সাধারণত ২-৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করা হয়। গুটি ইউরিয়া মাটির ৩-৪ ইঞ্চি গভীরে পুতে ব্যবহার করা হলে ছিটিয়ে গুড়া ইউরিয়া প্রয়োগের তুলনায় শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ সার কম লাগে। ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার জমি থেকে তেমন একটা নষ্ট হয় না এবং দীর্ঘ দিন এসব সারের কার্যকারিতা বজায় থাকে। তাই এসব সার ফসলের চাহিদা মোতাবেক বপন/রোপনের সময় একবারে প্রয়োগ করা যায়।

পুর্ববর্তী ফসলে সারের ব্যবহার

জমিতে প্রয়োগের পর ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সারের কার্যকারিতা দীর্ঘ দিন বজায় থাকে। এসব সার ব্যবহারকৃত ফসল কর্তৃক সামান্যই গৃহীত হয় এবং বাকি সার অবশিষ্টাংশ হিসেবে মাটিতে থেকে যায়, যা পরবর্তী ফসলে গ্রহণ করতে পারে। তাই পুর্ববর্তী ফসলে এসব সার বেশি ব্যবহার করা হয়ে থাকলে পরবর্তী ফসলে কিছুটা কম ব্যবহার করতে হয়।

সার প্রয়োগের সময় ও পদ্ধতি

বিষয়টির উপর এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

অন্যান্য বিষয়াদি-

ক) রাসায়নিক সার কোন বীজ, নতুন শিকড়, লতা-জাতীয় গাছের কান্ড ও কচি পাতারসংস্পর্শে বা অতি নিকটে প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। বীজের সংস্পর্শে সার প্রয়োগ করা হলে বীজ পঁচে যেতে পারে বা এর অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। এছাড়া ফসল ভিজা অবস্থায় কখনই সার প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। এতে ফসলের পাতা ও কচি অংশে সার লেগে গেলে তা বিনষ্ট হতে পারে।
খ) সার প্রয়োগের পর তা ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এতে সারের অপচয় কম হবে এবং কার্যকারিতা বাড়বে।
গ) ধানের জমিতে বেশি পানি থাকা অবস্থায় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। ইউরিয়া সার যেহেতু পানিতে দ্রুত গলে যায় তাই বেশি পানির মধ্যে এ সার প্রয়োগ করা হলে তা গলে পানির মধ্যেই থেকে যাায় এবং খুব অল্পপরিমাণ ধানের শিকড় পর্যন্ত পৌছাতে পারে। এতে সারের কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। জমিতে ছিপছিপে পানি থাকা অবস্থায় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলে এ সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
ঘ) জৈব সার ফসল বপন/রোপণের কমপক্ষে ৭ দিন পূর্বে জমিতে প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সবুজ সার হিসেবে ধৈঞ্চার চাষের পর ধান চাষ করা হলে ধৈঞ্চা মাটিতে মিশানোর ৭ দিনের মধ্যে ধানের চারা রোপণ করতে হবে। ধৈঞ্চা গাছের ফলন ৪০-৬০ কেজি/শতাংশ হলে ইউরিয়া সারের মাত্রা ২৫-৩০ ভাগ কমাতে হবে; পূর্ণ মাত্রায় ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হলে ধান গাছের দৈহিক বৃদ্ধি বেশি হয়ে হেলে পড়তে পারে এবং ধানের ফলন কমে যেতে পারে।
ঙ) ফসলের বর্ধণশীল অবস্থায় গৌণপুষ্টির (যেমন: দস্তা, বোরণ ইত্যাদি) অভাব দেখা দিলে এ সার পানিতে গুলিয়ে গাছের উপর স্প্রে করা যেতে পারে।সবজি ফসলের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বিশেষ উপযোগি।
চ) গুড়া ইউরিয়ার পরিবর্তে গুটি ইউরিয়া মাটির ৩-৪ ইঞ্চি গভীরে প্রয়োগ করলে শতকরা ৩০ ভাগ ইউরিয়া কম লাগে।গুটি ইউরিয়া মৌসুমে একবারপ্রয়োগ করতে হয় এবং পরবর্তীতে আর কোন ইউরিয়া প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। তবে দীর্ঘ মেয়াদী জাতের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণ ইউরিয়া উপরিপ্রয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।