• বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ফার্মগেট, ঢাকা – ১২১৫
  • info@barc.gov.bd
  • ০২-৯১৩৫৫৮৭

Online সার সুপারিশমালা

মাটির উর্বরতা

মাটির উর্বরতা বলতে মাটিতে কি পরিমাণে ফসলের খাদ্য উপাদান তথা পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান রয়েছে তা বুঝায়। ফসলের খাদ্য উপাদানের মূল উৎস মাটি। মাটিতে ফসলের অত্যাবশ্যকীয় সকল পুষ্টি উপাদান যেমন- নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার (গন্ধক), জিংক (দস্তা), বোরণ, কপার, আয়রণ, ম্যাঙ্গানিজ, মোলিবডেনাম ও ক্লোরিন বিদ্যমান রয়েছে। তবে জমি ভেদে এদের পরিমাণের তারতম্য রয়েছে অর্থাৎ জমির উর্বরতার ভিন্নতা রয়েছে। জমির উর্বরতা বিভিন্ন কারন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে মাটির গঠন ও প্রকৃতি, ভুমি শ্রেণী, মাটির প্রকার, মাটির পিএইচ তথা অম্লতা বা ক্ষারকত্ব, জৈব পদার্থ, অণুজৈবিক ক্রিয়াকলাপ, ফসল ও সার ব্যবস্থাপনা এবং পানি ব্যবস্থাপনা অন্যতম।

মাটি গঠনের মূল উপাদানের মধ্যেই উর্বরতার তারতম্য রয়েছে। সৃষ্টিগতভাবেই কোন কোন মাটি বেশি উর্বর আবার কোন কোন মাটি কম উর্বর। ভূমি শ্রেণি অর্থাৎ উঁচু, মাঝারি উঁচু, মাঝারি নিচু, নিচু এবং অতি নিচু জমির কারণেও জমির উর্বরতার পার্থক্য হয়ে থাকে। সাধারনত উচু জমি কম উর্বর এবং নিচু জমি বেশি উর্বর হয়ে থাকে। মাটির প্রকার অর্থাৎ বেলে মাটি, দোয়াশ মাটি ও এটেল মাটি এর মধ্যেও উর্বরতার পার্থক্য রয়েছে। দোয়াশ মাটি ও এটেল মাটির চেয়ে বেলে মাটি কম উর্বর। মাটির পিএইচ তথা অম্লতা ও ক্ষারকত্ব দ্বারা মাটির উর্বরতা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। অধিক অম্ল বা অধিক ক্ষারকত্ব বিশিষ্ট মাটি কৃষি কাজের জন্য তেমন উপযোগি নয়। এসব মাটিতে ফসলের খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তা ফসলের গ্রহণ উপযোগী আকারে থাকে না এবং ফসল তা গ্রহণ করতে পারে না। মৃদু অম্ল থেকে নিরপেক্ষ মাটি কৃষি কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

ফসল ও সার ব্যবস্থাপনা এবং পানি ব্যবস্থাপনাও মাটির উর্বরতাকে প্রভাবিত করে থাকে। ডাল জাতীয় ফসল এবং পাট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে থাকে। ডাল জাতীয় ফসলের শিকড়ে এক শ্রেণীর ব্যকটেরিয়া পারস্পরিক উপকারের নিমিত্তে এক ধরণের ছোট ছোট গুটি তৈরী করে। এসব গুটির মধ্যে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাধে এবং বাতাসের নিস্ক্রিয় নাইট্রোজেনকে ফসলের গ্রহণ উপযোগী আকারে গুটিতে জমা করে তা ফসলকে সরবরাহ করে। এর বিনিময়ে ব্যাকটেরিয়া ডাল গাছ থেকে তার প্রয়োজনীয় কার্বন (শক্তি) সংগ্রহ করে। গাছ বাতাস থেকে কার্বন গ্রহণ করতে পারে বিধায় এতে গাছের কোন ক্ষতি হয় না। ডাল ফসল এবং ব্যাকটেরিয়া এভাবে পারস্পরিক উপকারের নিমিত্তে একত্রে বসবাস করে। ডাল ফসল পাকার পর শিকড়ের এসব গুটি মাটিতে মিশে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। এজন্য ডাল কর্তনের সময় শিকড় মাটিতে রেখে দিলে জমির উর্বরতা বাড়ে। পাট চাষ করলে ৩-৪ মাস যাবৎ পাটের প্রচুর পাতা জমিতে পড়ে এবং এভাবে মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধির মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। পাটের শিকড় বেশ লম্বা হওয়ায় মাটির গভীর থেকে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করতে পারে এবং জমিতে পাতা পড়ার মাধ্যমে এসব পুষ্টি উপাদান মাটির উপরের স্তরে জমা হয়, যা পরবর্তী ফসল সহজেই গ্রহণ করতে পারে। এ কারণে যে কোন জমিতে বছরে একবার যে কোন ডাল জাতীয় ফসল বা পাট চাষ করলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

জমিতে বেশি চাষ দেয়া হলে এবং মাটি বেশি উলট পালট বা নাড়াচাড়া করা হলে মাটিতে বায়ু চলাচল বৃদ্ধি পায়। এতে মাটির জৈব পদার্থ বেশি বেশি বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলে জৈব পদার্থ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসে রুপান্তরিত হয়ে বায়ুমন্ডলে চলে যায়। এভাবে মাটির জৈব পদার্থ কমতে থাকে এবং সাথে সাথে মাটির উর্বরতাও কমতে থাকে। তাই জমিতে কম চাষ দেয়া এবং মাটি কম উলট পালট বা নাড়াচাড়া করা মাটির উর্বরতা রক্ষার জন্য সহায়ক। একইভাবে, জমি নিরবিচ্ছিন্নভাবে পানিতে নিমজ্জিত থাকলে বাতাসের অক্সিজেন সহজে মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। তাই মাটির জৈব পদার্থও নষ্ট হতে পারে না বরং বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেখা যায় সারা বছর ধারাবাহিকভাবে ধান চাষ করা হলে মাটির জৈব পদার্থ না কমে বরং কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এভাবে ফসলের পানি ব্যবস্থাপনাও মাটির উর্বরতাকে প্রভাবিত করে থাকে।